• ঢাকা
  • রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮
Bangla Bazaar
Bongosoft Ltd.

দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুম বন্ধ করা জরুরী


ইস্রাফিল রনি | বাংলাবাজার প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২১, ০২:৪৮ পিএম দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুম বন্ধ করা জরুরী
ছবি: সংগৃহীত

একনায়কতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রকে হটিয়ে সারা বিশ্বে এখন গণতন্ত্রের জয়জয়কার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর থেকে মানুষ মানবাধিকার প্রশ্নে তৎপর হয়েছে। বর্তমান সময়কে বলা হয় মানবাধিকারের স্বর্ণযুগ। কিন্তু এমন সময়ে জলজ্যান্ত মানুষ গুম হয়ে যাওয়া চরম উদ্বেগ এবং হতাশার বিষয়।

ইংলিশ দার্শনিক টমাস হবসের মতে মানুষ যখন প্রকৃতির রাজ্যে বাস করত তখন তাদের মধ্যে কোন নিয়ম শৃঙ্খলা ছিল না, ছিলোনা কোনো অধিকার এবং কর্তব্যবোধ, কিন্তু এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মানুষ এখন রাষ্ট্র গঠন করেছে, গঠন করেছে সরকার,আরো আছে জাতিসংঘ, মানবাধিকার সনদ। ঐতিহাসিকভাবে গুমের উৎপত্তি ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে নাৎসি বাহিনি দ্বারা। 

তারপর ক্রমান্বয়ে পোল্যান্ড, ফ্রান্স, চেকোস্লাভিয়ায় এবং অস্ট্রিয়ার মতো দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষকে গুম করে ফেলার কথা উঠে। পরবর্তি সময়ে সেন্ট্রাল আমেরিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক শাসকদের দ্বারা অগণিত মানুষ গুমের শিকার হয়। আস্তে আস্তে তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ৮০- ৯০ দশকে গুমের প্রবনতা এতই বেড়ে গিয়েছিলো যে রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনি দ্বারা বিশেষ করে সরকারের ভিন্ন মতের মানুষ এবং  সাধারণ  মানুষ পর্যন্ত গুম হওয়া শুরু হলো। এমন বিভৎস ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে জাতীসংঘ ২০০২ সালে গুম বিরোধী কার্যক্রম শুরু করে এবং ২০০৬ সালের দিকে গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক আইন রচনা করেন যার ইংরেজী নাম-"ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স এ্যগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসএ্যাপিয়ারেন্স"। 

সমাজে একটি মানুষের বিভিন্ন ধরনের অধিকার থাকে যেমন সামাজিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার  এসব অধিকার অর্জন করে নিতে হয় বা এর কিছু শর্ত থাকে। কিন্তু কিছু অধিকার একটি মানুষ জন্মের সাথে সাথেই অর্জন করে  তা হলো মানবাধিকার। এসব অধিকার ভোগ করার জন্য কোনো যোগ্যতা লাগেনা যেমন, বেঁচে থাকার অধিকার; জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার। এভাবে কোনো দল বা গোষ্ঠি যদি মানুষের এ সমস্ত অধিকারে হস্তক্ষেপ করে তা হবে মানবতা বিরোধী অপরাধ যা খুবই গুরুতর। 

বাংলাদেশে বহুল আলোচিত একটি শব্দ হলো 'গুম'। সম্পূর্ন বিচারবহির্ভূত একটি মানুষ ডিসএ্যাপিয়ারেন্স হয়ে যাওয়াকেই 'গুম' বলে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস খবই করুন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নিজস্ব বাহিনী দ্বারা যেসব নিষ্ঠুরতম বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের ঘটনা এ দেশে ঘটেছে তা মানুষ কখনোই ভুলবেনা। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরে আইন ও সালিস কেন্দ্রের দেয়া একটি তথ্যমতে বিগত ১৩ বছরে দেশে ৬০৪ জন মানুষ গুম হয়েছেন এর মধ্যে ৭৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ৮৯ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে  এবং ৫৭ জন কোনোভাবে ফিরে এসেছেন। বাকী এতগুলো মানুষের কোনো হদিস আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। 

তবে এ সমস্ত বিষয়ে সরকার বরাবর না সূচক জবাব দিয়ে আসছেন যে এ রকম কোনো ঘটনাই ঘটছেনা এবং এতে রাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কথা হলো এসবের সাথে যদি সম্পৃক্ততা না থাকে তবে কেন সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছেনা? কেন ভিক্টিম পরিবার এ থানায় ও থানায় ঘুরলেও মামলা দায়ের করাতে হিমশিম খায়? বিশেষজ্ঞদের মতে একটি দেশের উন্নয়নের পথে অন্তরায় গুলোর মধ্যে রয়েছে অস্থিতিশীল পরিবেশ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য, দূর্নীতি। 

আমরা জানি, দেশের জনগন এবং সরকার মিলেই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের উন্নতিতে সবার আগে প্রয়োজন হয় সরকার এবং জনগনের মাঝে সু-সম্পর্ক। আর এ সম্পর্ক বাস্তবায়নে প্রথমে দরকার সুশাসন নিশ্চিত করা। একটি দেশে সু-শাসন আছে কিনা তা নির্ভর করে ঐ দেশের মানুষের মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকার চর্চার উপর। একটি সমাজে যদি মানুষের মৌলিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয় এবং মানবাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে দেশে সৃষ্টি হয় সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। 

দেশের সরকারের সাথে মানুষের সৃষ্টি হয় চরম দ্বন্ধ, মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, মানুষের দেশপ্রেম লোপ পায়। এমতাবস্থায় মানুষ জ্বালাও পোড়াও নীতি অবলম্বন করে, এভাবে অবস্থা যখন তীব্র আকার ধারন করে আস্তে আস্তে মানুষ হয়ে উঠে হিংস্র তারা রাষ্ট্র বিরোধী কার্যক্রম শুরু করে; গঠন করে জঙ্গি গোষ্ঠি ক্রমান্বয়ে দেশে ছেয়ে যায় জঙ্গিবাদ। এমতাবস্থায় সরকারও হয়ে উঠে আরো হিংস্র বিদ্রোহীদের দমনে সরকার সকল ধরনের নিষ্ঠুরতম পন্থা অবলম্বন করে এটি কখনো রুপ নেয় গণহত্যার। সুতরাং এতে করে একটি দেশের সভ্যতা ধ্বংস হয় ব্যহত হয় অগ্রযাত্রা। 

শুরু হয় দুর্ভিক্ষ এবং অপুষ্টি আস্তে আস্তে রাষ্ট্রের কাঠামো এবং অস্তিত্বই ধ্বংস হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কথা বলতে পারি। আরব বসন্তের নামে যে মহা প্রলয় গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, নড়বড়ে করে দিয়েছে শাসকের মসনদকে এ বসন্ত সৃষ্টি হয়েছে সরকারের প্রতি জনগনের অসন্তোষের কারনেই। আরব বসন্ত শুরু হয় তিউনিশিয়ান যুবক বোয়াজিজির নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার মাধ্যমে। 

সকল প্রকার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে এমন কাজ বেছে নেয় সবজি বিক্রেতা এ যুবক। এর পর থেকে মানুষ নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার হয়। সারাদেশ জনবিক্ষোভে  ফেটে পড়ে। আন্দোলনের মুখে পতন হয় স্বৈরাচারী শাসকের। আস্তে-আস্তে এ বিক্ষোভের লেলিহান ছড়িয়ে পড়ে মিশর,লিবিয়া সিরিয়া,জর্ডান, ইয়েমেন সহ অনেক দেশে। এ বসন্তের গনজেয়ারে আজ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠেছে এক উত্তাল রণক্ষেত্র। এ থেকে আমাদের দেশকে শিক্ষা নেয়ার দরকার। 

আমাদের দেশে চলমান গুম হয়ে যাওয়ার যে ঘটনা তা নিরসনে সরকারের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতিসংঘের গুম বিষয়ক যে আইন তাতে ৮৩টি রাষ্ট্র সাক্ষর করলেও বাংলাদেশ বিরত ছিলো,আদালতে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গুমের বিষয়ে তিনটি রিট করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আদালত তিনটি রুল জারী করেছেন কিন্তু সরকারের কাছ থেকে কোনো উত্তর দেয়া হয়নি। সরকার বরাবরই গুমের ঘটনাগুলো এড়িয়ে গিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। 

আমরা আশা করি বর্তমান সরকার দ্রুত এ আইনে সাক্ষর করে সমাধানের দিকে আাগাবেন এবং সুষ্ঠ তদন্ত কমিটি গঠন করে গুমের বিষয়ে জিরো টলারেন্স ঘোষনা করবেন। যেহেতু বর্তমান সরকারের একটি টার্গেট দেশকে জঙ্গিমুক্ত করা তাই সরকারের এ বিষয়ে আরো অগ্রগামী হওয়া দরকার কারন দেশের মানুষকে যারা গুম করে ফেলে তারাই সবচেয়ে বড় জঙ্গি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সবুজ শ্যামল দেশের প্রত্যেক মানুষই নিশ্চয় চির সতেজ এবং দেশপ্রেমিক। 

এ জন্যই এত ছোট একটি রাষ্ট্রে বিশাল জনবহুল রাষ্ট্র হয়েও আমরা বরাবর উন্নয়নের দিকে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি। এমন দেশে জলজ্যন্ত মানুষ গুম হয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে তা আমরা কখনো মেনে নিতে পারিনা। আমরা আশঙ্কা করছি এমন পরিস্থিতি চলমান থাকলে মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ক্ষোভ সৃষ্টি হবে।  আমাদের এ দেশপ্রেমকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের উচিত মানুষের মানবাধিকারের উপর খেয়াল রাখা। 

এটি সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব মতামত

লেখকঃ ইস্রাফিল রনি। 
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।