• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮
Bangla Bazaar
Bongosoft Ltd.

গণমাধ্যম কী এখন মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যম!


প্রফেসর ডঃ মোঃ জাহানগীর কবির | বাংলাবাজার প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২১, ০৯:২০ পিএম গণমাধ্যম কী এখন মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যম!
প্রফেসর ডঃ মোঃ জাহানগীর কবির

মিডিয়া বা গনমাধ্যমের বহুবিধ সংজ্ঞার মধ্যে অন্যতম একটি  সংজ্ঞা হচ্ছে, “ যে মাধ্যম ব্যাপক মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে বা করে তাকে গনমাধ্যম বলে”।এই সংজ্ঞা থেকে দেখা যায়  যে টিভি, রেডিও, নিউজ পেপার, ম্যাগাজিন, বই এমনকি হাল আমলের ফেসবুক, ট্যুইটার, স্কাইপি, ইউ টিউব ইত্যাদিও গনমাধ্যম।

গনমাধ্যমকে প্রধানতঃ  তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়ঃ (১) প্রিন্ট মিডিয়া (২) ইল্যেকট্রনিক্স মিডিয়া এবং (৩) নিউ  মিডিয়া।নিউজ পেপার, ম্যাগাজিন, বই প্রিন্ট মিডিয়াভুক্ত। টিভি, রেডিও ইত্যাদি ইল্যেকট্রনিক্স মিডিয়াভুক্ত এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, স্কাইপি, ট্যুইটার ইত্যাদি নিউ মিডিয়া ভুক্ত।

গনমাধ্যমের দ্বারা আজকাল  শাসকের ইচ্ছানুযায়ী  জনগনের সাইকোলজি বা মনস্তত্ত্ব এর উপর প্রভাব বিস্তার করে মানুষের মননকেও রুপান্তরিত করা হচ্ছে।বর্তমানে গনমাধ্যমের ভুমিকা এত ব্যপকতা পেয়েছে যে, আমরা যা খাচ্ছি, বলছি, করছি, চলছি, পরছি তার সব কিছুই ঠিক করে দিচ্ছে গনমাধ্যম।বাংলা-ইংলিশ-হিন্দির মিশেলে কথা বলা যেই FM জেনারেশনের কথা আমরা বলছি, সেই FM জেনারেশন হিন্দি-বাংলা-ইংলিশের মিশেলে কথা বলার এই ফ্যাশন শিখছে কোথায় ? শিখছে, FM রেডিও নামক গনমাধ্যমের কাছ থেকে।ট্রেন্ডি হওয়ার জন্য, ফ্যাশন্যাবল হওয়ার জন্য বিভিন্ন স্টাইলের কাপড়-চোপড় আমরা পরছি।এসব স্টাইলগুলি ঠিক করে দিচ্ছে কারা ? উত্তরঃ গনমাধ্যম। 

স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে রিমোটের বোটাম টিপলেই চোখের সামনে হাজির হচ্ছে হাজারো চ্যানেল, হাজারো প্রোগ্রাম। স্টার জলসা, স্টার প্লাসের সিরিয়াল দেখে এসব সিরিয়ালের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পরিহিত পোষাক-পরিচ্ছদকে আমরা নিজের মধ্যে ধারন করছি। ফিল্ম বা নাটকের ফাঁকে সাবানের বিজ্ঞাপন, বডি স্প্রের বিজ্ঞাপনসহ দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত সব পণ্যের বিজ্ঞাপন আমাদের মাথায় স্থান করে নিচ্ছে। মোট কথা, আমাদের জীবনের নিত্য ব্যবহৃত সব পন্যই ঠিক করে দিচ্ছে গনমাধ্যম। বর্তমান পুজিবাদের এই দুনিয়ায় খেলা, বিনোদন, চিকিৎসা, শিক্ষা সব কিছুই চলে গেছে পুজিপতিদের দখলে। পুজিপতিরাই এখন ঠিক করে দিচ্ছে আমরা কি করব, আমরা কি বলব, আমরা কি খাব, আমরা কি পরব। এই পুজিপতিরাই বর্তমানে, হয় সরাসরি রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা অথবা পেছন থেকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারনকারী।গনমাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের চিন্তা-চেতনা-দৈনন্দিন যাপিত জীবনের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া হচ্ছে।

এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য মগজ ধোলাই এবং এন্টি মগজ ধোলাই নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক। ছোটকাল থেকেই আমরা আমাদের  কথা বলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আচার-আচরন শিখে বড় হতে থাকি। আরো একটু বড় হওয়ার পর স্কুল, কলেজের শিক্ষা, আত্মিয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা প্রভাবিত হই এবং শিক্ষা লাভ করি। এরপর আরো একটু বড় হয়ে কেউ জাতিয়তাবাদী, কেউ সমাজতান্ত্রিক, কেউ সাম্যবাদী, কেউ মানবতাবাদী, কেউ ভোগবাদী, কেউ পশুপ্রেমী, কেউ ধার্মিক, কেউ নাস্তিক, কেউ রাজনীতি বিমূখ, কেউ রাজনীতিবীদ, কেউ বামপন্থী, কেউ ডানপন্থী ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার শত শত দর্শন এবং পন্থায় বিভক্ত হয়ে  পড়ি। এগুলি সবই মগজ ধোলাই এবং এন্টি মগজ ধোলাইয়ের ফল।

যে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যে দর্শনে নিয়ন্ত্রিত সেই দেশের মিডিয়াও সেই দর্শনেই নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সিংহভাগ জনগনও সেই দর্শনেই মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়। আবার সেই দেশেরই কিছু কিছু মানুষ সেসব দর্শনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করে, এসব কিছু ভুল,  ভুল পথে চলছে দেশ, ভুল তত্ব-দর্শনে চলছে দেশ । এগুলিও আদতে একপ্রকার মগজ ধোলাই, মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে এন্টি মগজ ধোলাই।

পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ-মাওবাদের এন্টি মগজ ধোলাই। মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ-মাওবাদের মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে পুজিপতি-সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্ভাবিত ধর্মনিরপেক্ষতা-সাম্যবাদী-উন্নয়ন তত্ব। ধর্ম আর কুসংষ্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানচেতনা-বিজ্ঞানচর্চা এ সব কিছুই এক তত্বের মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে অপর তত্বের এন্টি মগজ ধোলাই। এই লেখাটির মধ্য দিয়ে যে বিষয় বা তত্বের অবতারনা করা হয়েছে তাও এক প্রকার মগজ ধোলাই এর  চেষ্টার অংশ। মিডিয়ার মাধ্যমে জনগনকে বোকা বানিয়ে কিভাবে শাসকগোষ্ঠী একের পর এক দূর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, একের পর এক অন্যায় করে চলেছে তার বিরুদ্ধে জনগনকে সচেতন করার, জাগানোর চেষ্টার এন্টি মগজ ধোলাই।

ছোটকাল থেকে সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান সিরিজ দেখে দেখে বড় হওয়া একটা শিশু বড় হয়ে সুপারম্যান, স্পাইডারম্যানের মত অন্যের জীবন বাচানোর চেষ্টার পরিবর্তে চোখের সামনে কোন অন্যায়-অত্যাচার হতে দেখলেও চুপ করে থাকে। এখন আমরা অন্যায়, অত্যাচার, দূর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিবর্তে কোন এক সুপার হিরোর প্রত্যাশায় থাকি। আশা করে থাকি, কোন এক সুপার হিরো হঠাৎ উপস্থিত হয়ে আমাদেরকে এই অবস্থা থেকে টেনে তুলবে। কেউ পানিতে ডুবে যেতে থাকলে এখন আমরা সেই ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর চেষ্টার পরিবর্তে আমার সবাই মিডিয়া কর্মীর ভুমিকায় অবতীর্ণ হই এবং অন্য  সবাইকে  চিৎকার করে বলতে থাকি, “কেউ ওকে বাঁচাও”। আমার বেশির ভাগই  গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করি। বর্তমানে এই অবস্থা সমাজের সর্ব ক্ষেত্রেই বিরাজমান। চোখের সামনে কাউকে খুন হতে দেখলেও চুপ করে থাকি। আমাকে তো কেউ খুন করছে না ! এই চিন্তা নিয়ে চুপ করে থাকি। এগুলি সবই বিকলাঙ্গ মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তা, আর এই জাতিয় বিকলাঙ্গ চিন্তাশীল মস্তিষ্ক সৃষ্টিতে অন্যতম ভুমিকা রাখছে গনমাধ্যম। 

বর্তমানে এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্রের ঝনঝনানির প্রয়োজন  হয় না। তেমনি একটি দেশের মধ্যে  জনগনকে নিয়ন্ত্রনে রাখার  জন্যও অস্ত্রের তেমন কমই প্রয়োজন হয়। ইদানিং  একটি দেশ অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে হাজির না থেকেও,ছায়া যুদ্ধের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে লিপ্ত থাকে। আজকাল আমেরিকা কিংবা চায়না, ইন্ডিয়ার সাথে ছায়া যুদ্ধে লিপ্ত থাকে  ইন্ডিয়ার মধ্যেকার বিভিন্ন স্বাধিনতাকামী,  স্বায়ত্বশাসনকামী সংগঠনকে সহায়তা প্রধানের মাধ্যমে। পাকিস্তান, ইন্ডিয়ার সাথে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত থাকে ইন্ডিয়ার মধ্যে ইসলামিক জঙ্গিবাদীদের সহায়তা প্রধানের মাধ্যমে। ইন্ডিয়া, বাংলাদেশের সাথে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত থাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠনকে সহায়তা প্রধানের মাধ্যমে। একই ভাবে কখনো কখনো বাংলাদেশ সহায়তা দেয় ইন্ডিয়ার বিভিন্ন সংগঠনকে। 

এই ভাবে ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর এক দেশ অন্য দেশের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য স্বীয়  স্বার্থের প্রয়োজনে অন্য দেশের ছোট ছোট সংগঠন গুলিকে ব্যবহার করছে। জীবাণু যুদ্ধ, ছায়া যুদ্ধ দিয়ে যেমন একটি দেশকে অন্য একটি দেশ বশে রাখতে পারে, ঠিক তেমনি সাইকোলজিক্যাল নিয়ন্ত্রন দিয়েও একটি দেশ অন্য একটি দেশকে এবং একটি রাষ্ট্র, নিজের দেশের জনগনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্র চরিত্র যতই জটিল হচ্ছে মগজধোলাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও ততই  বাড়ছে। বর্তমানে সম্মুখ যুদ্ধ, ছায়া যুদ্ধ, জীবাণু যুদ্ধের চেয়েও সাইকোলজিক্যাল ওয়্যার বা সাইকোলজিক্যাল নিয়ন্ত্রন অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে  প্রতীয়মান হয়েছে। 

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগের “মস্তিষ্ক যুদ্ধ” পরিকল্পনার পদক্ষেপ হলঃ
১। যারা শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবি তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলেই দেশকে নিয়ন্ত্রনে রাখা যাবে।

২। উন্নতিশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে যেখানে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ মানুষ গরিব, সেখানে সবাইকে ঠিকমত বাঁচতে দেওয়া অসম্ভব। এই গরিব মানুষগুলি যাতে তাদের দাবীদাওয়ার কথা তুলতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

৩। উচ্চবিত্তদের ক্যারিয়ারিস্ট করার আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে। শতকরা ১০ ভাগ এগিয়ে থাকাদের জন্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দাও। সাজানো ফ্লাট-গাড়ি-বিদেশী মদে ডুবিয়ে রাখো। প্রথমে তার চিন্তা থেকে সমাজ বাদ যায় । এরপর বাকি থাকে শুধুমাত্র পরিবার। কারন, আর যাই হোক ক্যারিয়ারিস্ট শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র নিজের কথায় ভাবে।

৪। তরুন এবং মধ্যবিত্তদের নিরন্তর উত্তেজনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে হবে। তরুনদেরকে উত্তেজিত রাখতে হবে নাচ, গান, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে। মধ্যবিত্তদের জন্য খবরের কাগজ থেকে টিভি চ্যানেলে গঠনমূলক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবরে জোর দিতে হবে। যুদ্ধ, ধর্ষন, খুন ইত্যাদি নেতিবাচক খবরে জোর দিতে হবে। আর এক শ্রেণীর অতি নিরীহ মধ্যবিত্তদের মজিয়ে রাখতে হবে ধর্ম, স্বর্গ-নরক, ভাগ্য ইত্যাদি বিষয়ে। এর জন্য প্রচার মাধ্যমগুলিতে এসব কিছু গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে হবে।

৫। যারা শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের ঘুম ভাঙাচ্ছে, তাদেরকে দেশদ্রোহী, বিচ্ছিন্নতাবাদী, উগ্রপন্থী ইত্যাদি বলে জেলে পুরে দিতে হবে। প্রচার করতে হবে রাষ্ট্রের অখন্ডতা প্রেমিরাই দেশপ্রেমী। দেশের শোষিত বঞ্চিত মানুষদের জন্য যারা লড়াই করে তাদেরকে এনকাউন্টারে শেষ করে দিয়ে প্রচার করতে হবে তারা কি ভয়ঙ্কর রকমের উগ্রপন্থী।

৬। কায়েমী স্বার্থ রক্ষার জন্য বাকি দেশবাসীদের মগজধোলাইয়ের জন্য সম্ভাব্য সব পথই গ্রহণ করতে হবে।
আমেরিকার মস্তিষ্ক যুদ্ধ পরিকল্পনার পদক্ষেপগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এই পরিকল্পনার প্রতিটি পদক্ষেপেই মিডিয়া বা গনমাধ্যমের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এইসব  পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করেই বর্তমানে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানরা সেদেশের জনগনের মগজ ধোলাই করে চলেছে আর আমেরিকা এবং অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারনবাদী শক্তিগুলো ঐসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে হাতের মুঠোয়  রেখে তাদের স্বীয়  স্বার্থ বাস্তবায়ন করে চলেছে।

লেখকঃ প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিকতা ও গনমাধ্যম বিভাগ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 

"এটি সম্পুর্ন লেখকের নিজস্ব মতামত"