• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮
Bangla Bazaar
Bongosoft Ltd.

পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু বিচার বিভাগের লজ্জা !


ইস্রাফিল রনি | বাংলাবাজার প্রকাশিত: জুন ২, ২০২১, ০৯:৩১ পিএম পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু বিচার বিভাগের লজ্জা !
ছবি: বাংলাবাজার

একটি সমাজ কতটা সভ্য তা নির্ভর করে ঐ সমাজের আইন ও বিচার ব্যবস্থার উপর। আদিম যুগে ন্যায়-নীতি এবং বাছ-বিচারের কোনো প্রচলন ছিলোনা বলেই আমরা সে যুগকে বর্বর যুগ বলি,সে সমাজকে অসভ্য সমাজ বলি।

লর্ড চ্যথাম বলেছেন, "আইন  যেখানে শেষ অত্যাচার সেখানে শুরু" ন্যায় বিচার পাওয়ার পূর্বশর্ত যেমন ন্যায় পরায়ন, সৎ ও দক্ষ বিচারক; তেমনি বিশেষ করে ফৌজদারি মামলায় প্রকৃত আসামিকে আইনের আওতায় আনার গুরু দায়ীত্ব আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। বর্তমানে অপরাধ এবং অপরাধী শনাক্তে 'রিমান্ড' শব্দটি বহুলালোচিত। রিমান্ড’ ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা অর্থ হল পুনঃপ্রেরণ; তবে আমাদের আইনাঙ্গনে ইংরেজি রিমান্ড শব্দটি বহুল অর্থে ব্যবহৃত হয়। আইনাঙ্গনে রিমান্ড অর্থ বিচারিক আদেশের মাধ্যমে মামলা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে পুলিশের হেফাজতে প্রদান।

কিন্তু 'বাংলাদেশ সংবিধান ১৯৭২' এ কোথাও 'রিমান্ড' শব্দটি উল্লেখ করা নেই। বরং, ধারা ৩৫ (৪) মতে - কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবেনা। কিন্তু রিমান্ড শব্দটি বর্তমানে অপরাধী শনাক্তের মহা হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ শব্দটি এতই বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে যে যা কোনো সভ্য সমাজ কখনো আশা করেনি। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাদের উপর যে অমানুষিক  নির্যাতন করা হয় তা গা শিউরে উঠার মত। রিমান্ডের নামে পুলিশি নির্যাতনের ভয়াবহতায় মানুষ স্ব জ্ঞানে বা অজ্ঞানে অপরাধ স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবে এটিই স্বাভাবিক।এমতাবস্থায় ন্যায় বিচার আশা করাটাও অসম্ভব, কারণ একটি মানুষের উপর যখন দোষ স্বীকার করানোর জন্যই ক্রমাগত নির্যাতন করা হয় তখন সে নিযার্তন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য হলেও দায় স্বীকার করে নেবে। ন্যায়বিচার যেভাবে অভিযোগ কারীর জন্য প্রয়োজন ঠিক তেমনি অভিযুক্তের জন্যও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অভিযুক্তের উপর কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি না দেয়ার বিধান রয়েছে। তার গ্রেপ্তারের কারণ সে নিজেকে এবং তার পরিবারের কাছে নোটিশ দেয়ার বিধান রয়েছে। নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেয়াও অভিযুক্তদের সাংবিধানিক অধিকার। যাই হোক, তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ বা দুধর্ষ আসামির ক্ষেতে প্রলম্বিত  জিজ্ঞাসাবাদ বিশ্বের প্রায় সকল ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দেখা যায়। এভাবে  ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯৯৮- এর দুটি ধারা ১৬৭ ও ৩৪৪ এ রিমান্ড শব্দটি উল্লেখ করা আছে। ১৬৭- তে বলা হয়েছে, তদন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ না হলে, অভিযোগ বস্তুনিষ্ঠ মনে হলে,তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিমান্ড দাবী করতে পারেন। ধারা ৩৪৪-মতে,তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে যদি মনে হয় রিমান্ড দিলে আরো বেশি তথ্য পাওয়া যাবে, তবে তিনি অনধিক ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারেন। উক্ত ধারার ফাঁকফোকরের আশ্রয়ে বাংলাদেশে রিমান্ডের নামে অভিযুক্তদের লাঞ্ছনাকর শাস্তি দেয়া হচ্ছে। পুলিশি রিমান্ডেই মৃত্যু হয়েছে এমন নজীর বাংলাদেশে অহরহ। এমন বিভৎসতায় 

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড ট্রাস্টসহ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা রিমান্ড প্রশ্নে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করে। উক্ত রিটে হাইকোর্ট কয়েকটি নির্দেশনা দেয়।

১, আটকাদেশ ( ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবেনা।

২, গ্রেপ্তারের কারণ একটি নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে।

৩, অভিযুক্তের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার ডাক্তারি পরীক্ষা এবং সনদ লাগবে।

৪, জিজ্ঞাসাবাদ রিমান্ড প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে কাচনির্মিত কক্ষে করতে হবে; বাইরে তার আইনজীবী এবং পরিবারও থাকতে পারবেন।

আজ থেকে ২ যুগ আগের মামলা গুলো পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় তখন খুব কম সংখ্যক রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর হতো।ম্যাজিস্ট্রেটরা এক্ষেত্রে অনেক কিছু বিবেচনায় নিতেন কিন্তু বর্তমানে গণহারে রিমান্ড মঞ্জুরের ঘটনা দেশের আইন ও ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন বর্বতাকেতো প্রশ্রয় দেওয়া যায়না; এতে বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।১৯৮৪ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে নিউইয়র্কে নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে সনদটিতে স্বাক্ষরদান করে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৩৫(৫)-এর বিধান অনুযায়ী নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ বিধায় জাতিসংঘ সনদ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে কার্যকর রূপ দেয়ার লক্ষ্যে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়।

২০১৩ সালে প্রণীত আইনটিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যুকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে দণ্ড দেয়ার বিধান করা হয়েছে। আইনটিতে হেফাজতে মৃত্যুর যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘হেফাজতে মৃত্যু’ অর্থ সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু; এ ছাড়াও হেফাজতে মৃত্যু বলতে অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক গ্রেফতারকালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকেও নির্দেশ করবে; কোনো মামলায় সাক্ষী হোক বা না হোক জিজ্ঞাসাবাদকালে মৃত্যুও হেফাজতে মৃত্যুর অন্তর্ভুক্ত হবে। আইনটির ভাষ্য মতে ‘সরকারি কর্মকর্তা’ অর্থ- প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপরদিকে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অর্থ- সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী অথবা অপর কোনো রাষ্ট্রীয় ইউনিট, যা বাংলাদেশ প্রতিরক্ষার জন্য গঠিত। আইনটিতে প্রদত্ত ‘হেফাজতে মৃত্যু’-এর সংজ্ঞা পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, উক্ত সংজ্ঞায় সরকারি কর্মকর্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতকে অন্তর্ভুক্ত করলেও সশস্ত্র বাহিনীর হেফাজতকে অন্তর্ভুক্ত করে না। আইনটিতে নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে মৃত্যু সংঘটনের জন্য অন্যূন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং এর অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রয়েছে। অপরদিকে শুধু নির্যাতনের ক্ষেত্রে অন্যূন ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অন্যূন ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং এর অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে আমাদের দেশে পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু্র মামলা গুলোয় ভিক্টিম পক্ষ আশানুরূপ রায় পায়না বললেই চলে। তবে, ২০১৪ সালে পুলিশের হেফাজতে মোহাম্মদ জনি নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত ৯ই সেপ্টেম্বর ৫ জন আসামীর মধ্যে তিন জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। অপর দুই জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আশা করি অসাংবিধানিক রিমান্ড এবং পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ক্ষেত্রে উক্ত রায়টি মাইলফলক হয়ে থাকবে। একটি মামলার অগ্রগতি এবং ফলাফল যেভাবে তদন্তের সুষ্ঠু তদন্তের উপরই নির্ভর করে তাই তদন্ত হোক বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ। বর্তমানে মানবাধিকারের স্বর্ণ যুগেও এমন অমানবিক অসাংবিধানিক রিমান্ড কে না বলাই এখন সময়ের দাবী। 

 

লেখক: ইস্রাফিল রনি-

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।