• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৪ মে, ২০২১, ৩০ বৈশাখ ১৪২৮
Bangla Bazaar
Bongosoft Ltd.

‍‍`প্রক্টর ক্যাম্পাসের ভূস্বামী আর ছাত্ররা সব প্রজা‍‍`


জিকে সাদিক | বাংলাবাজার প্রকাশিত: মে ১, ২০২১, ১১:৩৩ এএম ‍‍`প্রক্টর ক্যাম্পাসের ভূস্বামী আর ছাত্ররা সব প্রজা‍‍`
ছবি: বাংলাবাজার

সারাদেশে এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে না যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের উপর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজি-খুশি আছে। পরিস্থিতি এমন যে 'প্রক্টর' শব্দটি এখন অনেকটা অসম্মানজনক কিম্বা গালি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন আজকে আমাকে হঠাৎ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সুহৃদ শিক্ষার্থী বলে ফেললেন, 'আপনিও কি প্রক্টর হয়ে গেলেন?' সত্যি বলতে তখন আমি অসম্মানিত বোধ করেছি।

প্রক্টর সম্প্রদায়ের কাজটা আসলে কী? বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বরত প্রক্টর মহোদয়দের আচরণ ও কাজ দেখে তাদের কাজ কোনটা সেটা বুঝা মুশকিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া প্রক্টরদের কাজ না কি তাদেরকে আরও নিরাপত্তাহীন করে ফেলা তাদের কাজ এইটাই এখন বড় প্রশ্ন। প্রক্টরদের নিয়ে সারাদেশের সব কটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাই খুব বাজে। যেমন প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের প্রক্টরের কথা ধরা যাক। তার ক্যাম্পাসে কেউ পিটানি খেয়ে আধামরা হয়ে গেলেও তাকে তখন পাওয়া যায় না। পরে সাংবাদিকরা যখন তাকে প্রশ্ন করে যে, 'স্যার আপনি কী ঘটনাস্থলে ছিলেন?' প্রক্টর মহোদয় তখন বলেন, 'আমি ঘটনা সম্পর্কে শুনেছি, কিন্তু ভিক্টিম আমাকে ফোন করে সাহায্য চায়নি বলে আমি সেখানে যাইনি।' তারপর সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করে, 'স্যার এই ঘটনা নিয়ে এখন আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?' তখন প্রক্টর মহোদয় বলেন, 'আমরা ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছি লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।' এই হলো প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের প্রক্টরের বয়ান। এমন বয়ান সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরদের।

দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা তো আরও বাজে। এখানে প্রক্টরের আচরণে বা দায়িত্ব অবহেলার বিরুদ্ধেও যদি শিক্ষার্থীরা কোনো কর্মসূচি পালন করতে যায় তাহলেও প্রক্টর মহোদয়ের কাছে অনুমতি নেওয়া লাগে। ভিসি বিরোধী আন্দোলন করবে সেটাও প্রক্টরের কাছে অনুমতি নিয়েই করতে হবে। খোদ প্রক্টর বিরোধী আন্দোলনও প্রক্টরের কাছে অনুমতি নিয়েই করতে হবে। এ এক আজব দুনিয়া। ক্যাম্পাসে কেউ চড়ুইভাতি করতে চাইলেও প্রক্টরের অনুমতি লাগবে। এই অনুমতি নেয়ার মানেটাই হচ্ছে প্রক্টর ক্যাম্পাসের অধিপতি মানে তিনি ভূস্বামী আর ছাত্ররা সব প্রজা। অথচ ক্যাম্পাসের মালিক হলো শিক্ষার্থীরা। প্রক্টরকে বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদে, নির্বিঘ্নে তাদের সব কিছু করতে পারে সেটা নিশ্চিত করবে। উল্টো তারাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্টেক হোল্ডার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এর বাইরে ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর, রেজিস্ট্রার, ডিন, বিভাগের সভাপতি, শিক্ষক থেকে শুরু করে একটা পিয়ন সবই শিক্ষার্থীদের জন্য। সোজা করে বললে সবাই শিক্ষার্থীর সার্ভিস দিবে। বঙ্গদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘটছে উল্টো। এখানে ভিসি মানে তো মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি; পীর, ব্রাহ্মণ, মোড়ল কিম্বা সামান্ত রাজা বা আর যা মনে আসে বলতে পারেন। ভিসিকে নিয়ে কেউ কিছু বলছে তো সে শ্যাষ। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিরোধী উল্টাপাল্টা কিছু করে তাহলে শিক্ষার্থীরা চাইলে তাকে 'চোদানীর পুত' বলে গালি দিতে পারবে এই রাইট থাকা দরকার। কারণ তাকে দায়িত্বই দেয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে সে এসে তার দায়িত্ব পালন না করে উল্টাপাল্টা করলে তাকে অবশ্যই গালি দেয়া জায়েজ। এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু বঙ্গদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিসির কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করা মানেই ওই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ খায়ে দিবে। 

আর প্রক্টর সে তো 'ভগবান'। উনার কাজই হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরকে শুটিয়ে লাল করে দেও। আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেয়া, বহিষ্কারের হুমকি দেয়া। গায়ে হাত দিতেও কসুর করে না। আমি বাজি ধরে বলছি শিক্ষার্থীরা যদি সুযোগ পাইত তাহলে প্রত্যেকটা প্রক্টরকে কলার ধরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা থাপড়াই তো। এতো তাদের ক্ষোভ। ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রক্টরদের সালাম দেয় ঠেকে। নয়তো কোথায় ধরে বসে আবার। এই ভয়তে সালাম দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব খানে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। গেইটে কড়া পাহারা বসানো হয়, সারাক্ষণ পুলিশ রাখা হয়। মানে এতো আয়োজন নিরাপত্তা নাম করে। কিন্তু একটা মারামারি হলে দেখা যায় সিসিটিভি ক্যামেরা কাজ করে না, ফুটেজ নাই। দেশীয় অস্ত্র কিম্বা ম্যাশিন ফুটালেও প্রক্টর তখন আল্লাহর নামে কানা থাকেন। উনি কিছুই দেখেন নাই। মারামারি লেগে রক্তারক্তি করার পর পরিস্থিতি শান্ত হলে তার চোখের দৃষ্টি শক্তি ফিরে আসে। তখন তিনি পুলিশ নিয়ে দৌড়ে এসে সাংবাদিকদের সামনে খাড়া হয়ে বলেন, 'ছাত্রদের দু'পক্ষের একটা ঝামেলা হয়েছিল আমরা কঠোর অবস্থান নিয়ে সেটা ঠেকিয়েছি।' এদিকে মেডিক্যালে ভর্তি আছে অনেকেই। 

এইবার আসি মূল কথায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের যাবতীয় কার্যক্রম করবে প্রক্টরের কাছে অনুমতি নেয়ার কিছু নাই। সর্বোচ্চ এটা করা যায় যে, ছাত্ররা তাকে জানাবে আমরা এই ধরনের একটা কাজ করছি আপনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। অনুমতি দেন এমন আলাপই ঠিক না। প্রক্টর বাধা দিবে তো দূরে থাক। একজন শিক্ষার্থী বান্ধবী নিয়ে ঘুরবে না কি বৌ নিয়ে ঘুরবে এটা সম্পূর্ণ তার স্বাধীনতা। এনিয়ে প্রক্টরের মাথা ঘামানোর কোনো রাইট নাই। তার কাজ হচ্ছে ওই শিক্ষার্থী যেন কোনোভাবে আক্রান্ত না হন সেটা নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ধরনের ফল গাছ থাকে। সেগুলো ছাত্রদের জন্য। সেই ফল নিরাপদে রাখা প্রক্টরের দায়িত্ব। ছাত্ররা ফল পেড়ে খাবে সেটারও নিরাপত্তা দিবে। বাঁধা দেয়া কিম্বা খারাপ আচরণ করা তো দূরে থাক। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মহোদয়গণের ভাবা উচিত। তারা অতি পেশাদারিত্ব দেখাচ্ছেন না তো? প্রক্টরদের মাথায় রাখা উচিত তিনারা শিক্ষক, সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র। পুলিশি আচরণ তাদের শোভা পায় না। তারা ইতর শ্রেণির প্রাণীও না। তেমন কোনো কাজকর্ম তাদের লেভেলের সাথে মানায় না।

জিকে সাদিক

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী

বি.দ্র. এটি লেখকের নিজস্ব মতামত