• ঢাকা
  • রবিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮
Bangla Bazaar
Bongosoft Ltd.

গুহার  বাসিন্দাদের  উদাহরন দিয়ে প্লেটো যা বুঝাতে চেয়েছেন


মোহাম্মদ মীর হোসেন মজুমদার | বাংলাবাজার প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২১, ১১:১৮ পিএম গুহার  বাসিন্দাদের  উদাহরন দিয়ে প্লেটো যা বুঝাতে চেয়েছেন
ছবি: বাংলাবাজার

প্রায় দু হাজার বছর আগে বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো আমাদের বাস্তব অস্তিত্ব কী এবং আমাদের সত্যিই কী বাস্তব অস্তিত্ব অস্তিত্বশীল এ প্রশ্ন উত্থাপন করে গেছেন। তাঁর বিখ্যাত “রিপাবলিক” বইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে ‘‘Allegory of the Cave” বা গুহার রূপক গল্পে তিনি চমৎকার একটি গল্পের মাধ্যমে আমাদের বাস্তব অস্তিত্বের একটি ধারণা দিয়েছেন। 

ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণে প্রাপ্ত জ্ঞান যে ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয় বরং ভ্রান্তিতে পরিপূর্ণ তা প্লেটো গুহার গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেন। গুহার রূপকতায় প্লেটো ছায়ার জগত ও আলোর জগতের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে ভাববাদের সমর্থন করেন।

গুহার রূপকতত্ত্ব:

‘গুহার রূপকতায়’ প্লেটো একটি দৃশ্য অঙ্কন করেন যেখানে একদল বন্দি, যাদেরকে তাদের পুরো জীবন ধরে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। বন্দিদের অন্ধকার গুহায় আলোর বিপরীতে দেয়ালের পাশে রাখা হয়েছে যেখানে তাদের সামনে মঞ্চের পর্দার উপর পিছনের বস্তুসমূহের দৃশ্য ভেসে ওঠবে।

ভূ-গর্ভস্থ গুহার প্রবেশ পথটি দীর্ঘ, গুহায় আলোর প্রবেশের পথ রয়েছে। শৈশব থেকে বন্দিদের পায়ে এবং ঘাড়ে শিকল বাঁধা রয়েছে, যাতে তাঁরা স্থির থাকে, কেবল সামনের দৃশ্য দেখতে পায়, মাথা ঘুরাতে না পাড়ার কারনে তারা পেছনে থাকাতে পারেনা।

প্রত্যেক দিন গুহার প্রবেশপথে মানুষ, বিভিন্ন প্রাণী চলাচল করে।গুহার লোকদের পিছনে একটু উঁচু জায়গায় আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা থাকবে। বন্দিরা চলাচলকারি মানুষ ও প্রাণীর প্রতিচ্ছবি বা ছায়া তাদের সামনের পর্দায় দেখতে পায় এবং মানুষ ও প্রাণীর বহনকৃত পাথরের বা বস্তু থেকে শব্দ শনতে পায়।

বন্দিদের কাছে চলাচলকারি মানুষ ও প্রাণীর ছায়াকে সম্পূর্ণ বাস্তব আকৃতির বস্তু হিসেবে মনে হবে কারন তারা ছায়া ভিন্ন অন্য কিছু দেখার সুযোগ পায়নি।

এখন কল্পনা করা যাক, একজন বন্দি গুহা থেকে পালিয়ে গেল এবং গুহার বাইরে এসে জ্বলমল রোদে সে হাঁটতে লাগল।

জীবনে প্রথমবারের মত সে রোদের আলোর স্পর্শে এসে ভিন্ন এক বৃহৎ জগত দেখতে পেল। সে বুঝতে পারল এতদিন ধরে ছায়ার আকার আকৃতি ও সত্তাকে সত্য হিসেবে মনে করেছিল তা ছিল আসলে মিথ্যা।

এ রূপগল্পে সক্রেটিস তার শিস্যকে জিজ্ঞেস করলেন, ঐ ব্যক্তি গুহার তার সঙ্গীদের ব্যাপারে কি ভাববেন? তিনি তাদের জন্য দু:খ অনুভব করবেন এবং তাদের সীমিত বাস্তবতার জ্ঞানের জন্য আফসোস করবেন।

এখন তিনি যদি গুহায় ফিরে আসেন, বন্দীদের তিনি যা দেখেছেন তা বর্ণনা করেন, তারা হয়ত খুব হাসাহাসি করবে এবং লোকটিকে পাগল বলে ধরে নিবে।

প্লেটোর গুহার রূপক থেকে কী শিক্ষা নেয়া যায়?
প্লেটো এমন দার্শনিক যিনি রূপকের মাধ্যমে তার দর্শন ব্যাখ্যার চেষ্টা করতেন। তিনি প্রথাগত ধারনার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতেন।দেশ কাল সময় অনুযায়ী তার দর্শনকে প্রয়োজন অনুসারে ব্যাখার সুযোগ থাকে। তিনি মানুষের চিন্তার আড়ষ্টতা ভাঙ্গার রশদ জোগাতেন।

প্লেটোর গুহার রূপক থেকে বহু শিক্ষার ইঙ্গিত মিলে তবে ধরে নেয়া হয় ভাববাদকে বুঝাতে তার গল্পটি যথার্থ।

বাস্তববাদে, আমাদের প্রত্যক্ষণ যা ইন্দিয়ের মাধ্যমে পাই শুধু তারই অস্তিত্ব রয়েছে, প্রত্যক্ষণের বাইরে কোন জগত নাই। বস্তুটি অস্তিত্বশীল আছে বিধায় আমাদের মন বস্তুটি সম্পর্কে জানতে পারে।প্রথমে বস্তুর অস্তিত্ব পরে মন টের পায়। বাস্তববাদীরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরে অন্য কোন জগতকে স্বীকার করেনা। ধর্মীয় দৃস্টিতে পরকালের জগতকেও তারা অস্বীকার করে।

প্লেটোর গুহার গল্পে আমরা দুটি জগত দেখতে পাই, একটি বন্দীদের সামনে ছায়ার জগত আরেকটি বন্দিদের অজ্ঞাতে আলোর জগত বা প্রকৃত জগত। বন্দিরা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে শুধুমাত্র ছায়ার জগতের সংবেদনের জ্ঞান প্রাপ্ত হয় কিন্তু তাদের ইন্দ্রিয়ের ঊর্ধ্বেও যে জগত রয়েছে সে জ্ঞান তাদের মাঝে থাকেনা ।

প্লেটো তার গুহার গল্পে জ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষের সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করেছেন। মানুষ যা দেখে বা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণ করে তা নিশ্চিত জ্ঞান নয়, জ্ঞানের একটি অংশ হতে পারে।মানুষের জানার বাইরেও জ্ঞান বা সত্য রয়েছে।

গুহার বন্দিরা সে র‌্যের আলো, চলন্ত মানুষ প্রভৃতির ছায়াকে প্রকৃত সত্য বা জ্ঞান বলে ধরে নিয়েছিল যতক্ষণ না তাদের একজন গুহার বাইরে এসে প্রকৃত আলো বাতাসের সন্ধান পেয়েছিল। যদি একজন বন্দি বের না হত তাহলে সকল বন্দি ছায়ার জগত বা মিথ্যার জগতকে প্রকৃত জগত ভেবে জীবন পার করত।

জার্মান দার্শনিক ইমান্যুয়েল কান্টের মতে দুটি জগত রয়েছে, একটি অবভাসিক বা ইন্দ্রিয়জগত অন্যটি অতীন্দ্রিয় জগত বা আসল জগত। কান্টের মতে, মানুষ শুধু অবভাসিক জগতের জ্ঞান লাভ করতে পারে কিন্তু প্রকৃত জগত সম্পর্কে সে জানতে পারেনা । মানুষের মধ্যে অতীন্দ্রিয় আত্মা বা মন আছে তা জানা যায়না

গুহার বন্দিরা যে জগতে বাস করে সেটি হচ্ছে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত, একজন যে বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল তা গুহার জগতের তুলনায় অতীন্দ্রিয় জগত বা প্রকৃত জগত। 

বন্দিরা যদি পরস্পর এ বিষয়ে একমত হয় যে, সকল বস্তুর আকৃতি ছায়ার মত তবে তাদের কথাটি তাদের জন্য সত্য হলেও প্রকৃত বিচারে এটি সত্য নয় অর্থাৎ শুধু প্রত্যক্ষণের উপর নির্ভর করে সত্যকে পাওয়া যায়না। জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষণের বাইরে ধারণার গুরুত্ব আছে।

ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষণ বা সংবেদন সত্য বলে বিবেচিত হবেনা যতক্ষন না তা পরম বা সত্ত্বার ধারণা দ্বারা যাচাইযোগ্য হবে।

বন্দিটি ফিরে তার সঙ্গিদের ছায়ার জগতের ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করলে তারা হয়ত হাসাহাসি করবে তাকে পাগল ভাববে। মানুষ তার বিদ্যমান চিন্তাকে সঠিক ভেবে সামনে অগ্রসর হয় এতে সঠিক চিন্তা প্রবেশ করলে সহজেই তা মেনে নেয়না, নতুন চিন্তাকর্তাকে অজ্ঞ, সুবিধাবাদি হিসেবে চিহ্নিত করে।

বন্দিদের থেকে একজন যদি পালিয়ে বের হওয়ার সুযোগ না পেত তবে সকলেই ছায়ার জগতকেই সত্য ধরে নিয়ে জীবন পার করত। আবার পালিয়ে আসা বন্দির সাথে তারা যদি গুহা থেকে বের হয়ে আসে তবে ছায়াকে সত্য বলে ধরে নেয়ায় তারা দু:খ অনুভব করত। 

তারা বুঝতে পারত ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণে প্রাপ্ত সংবেদন বা জ্ঞান ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়।

সঙ্গিদের মাঝে দুধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে।কেউ তাকে গ্রহন করতে পারে। তার কাছের প্রিয়, বিশ্বস্থ লোকেরা তাকে গ্রহন করতে পারে। তবে আমরা দেখি পরিবর্তনের অঙ্গিকার নিয়ে কেউ অগ্রসর হতে চাইলে অধিকাংশই বিরোধিতা করে কারন কেউ নিজের চিন্তার বাইরের অন্য কাউকে সহজে গ্রহন করার মানসিকতা রাখেনা।

পালিয়ে আসা বন্দিটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত থেকে অতীন্দ্রিয় জগতে পৌছানোর একটি রূপক। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা । এ যাত্রা সহজ নয়। সকলে বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য পালানোর সাহস রাখেনা।

অত্যন্ত ধীশক্তি সম্পন্ন ব্যাক্তি নতুন পথ খুজে পেতে চায়। সমমানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কোন একজনকে বিদ্রোহ করতে হয়। এ বিদ্রোহে সকলের সমর্থন থাকেনা কিন্তু বিদ্রোহে মুক্তির আনন্দ আছে।

প্লেটোর গুহার রূপকে সংশয়বাদের ব্যবহার পাওয়া যায়, ব্যক্তিকে তার বিদ্যমান চিন্তা বিশ্বাসের সাথে সংশয় করতে হবে, স্থির থাকলে পথ খুজে পাওয়া যাবেনা। নিজস্ব চিন্তার বলয় থেকে বের হয়ে তাকে চিন্তা করতে হবে। পূর্ব থেকে ধরে নেয়া তত্ত্বে ভ্রান্তি থাকতে পারে এটি মানার মানসিকতা থাকতে হবে।

শেষকথা: প্লেটোর গুহার রূপকের যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে তা ইন্দ্রিয়জগত থেকে আসলজগতের।মানুষই সত্যের মাপকাঠি নয়। মানুষের ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের সংবেদন সকল সময়ে সঠিক জ্ঞান দিতে পারেনা। মানুষের মনে বস্তু সম্পর্কিত ধারণা আগে থেকেই থাকে।ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের বাইরেও জগত রয়েছে, ব্যক্তির প্রত্যক্ষণ সে জগতের সন্ধান নাও পেতে পারে।

তথ্যসূত্র:
The Republic: Plato
ড. এম হুদা- সাধারণ দর্শনের মূলতত্ত্ব, (এম.বি. প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৯০)

মোহাম্মদ মীর হোসেন মজুমদার
প্রভাষক, দর্শন বিভাগ
ফেনী সরকারি কলেজ, ফেনী
mhm.mazum@gmail.com